ভূরাজনৈতিক এ উত্তেজনার মধ্যেও আন্তর্জাতিক শস্য সরবরাহ ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত বেশ স্থিতিশীল রয়েছে। তবে এ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পণ্য পরিবহনের খরচ বা ফ্রেট রেট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। খবর ওয়ার্ল্ডগ্রেইনডটকম।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুয়েজ খাল ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো দিয়ে বর্তমানে শস্য আমদানি-রফতানি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ চেইনের দুই প্রান্তেই জাহাজের ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এ পরিস্থিতির স্থায়িত্ব কতটা হবে, তা নির্ভর করছে মূলত যুদ্ধের মেয়াদের ওপর। যদি দ্রুত এ সংকটের সমাধান হয়, তবে বাজার আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জলপথে পরিবাহিত শস্য ও তৈলবীজের প্রায় ১৩-১৫ শতাংশ সুয়েজ খালের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। এছাড়া বিশ্ববাজারে কেনাবেচা হওয়া গম ও চালের প্রায় ১৫-১৭ শতাংশ এ নৌপথ ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে আমদানিকারক ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হচ্ছে।
এদিকে এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ভারতীয় রফতানিকারকরা এরই মধ্যে সংকটে পড়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজের ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় ভারতের বাসমতী চালের বড় একটি অংশ মাঝসমুদ্রে ও বন্দরগুলোয় আটকা পড়ে আছে। ভারতের বাসমতী চালের অর্ধেকের বেশি রফতানি হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। হুট করে এ বিশাল পরিমাণ চালের নতুন কোনো বিকল্প বাজার খুঁজে পাওয়াও প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শস্যের পাশাপাশি সারের বাজারেও অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সংঘাত অব্যাহত থাকলে সরবরাহকারীরা অনেক ক্ষেত্রে পণ্য পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করতে পারেন। এতে সারের ঘাটতি দেখা দেয়ার পাশাপাশি দাম আরো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এরই মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেল ও গমের দাম দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, করোনা মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বড় বড় সংকট মোকাবেলা করে বৈশ্বিক শস্য খাত যথেষ্ট ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মতো বড় রফতানিকারক দেশগুলো তাদের বন্দর ব্যবহার করে শস্য সরবরাহ সচল রেখেছে। বড় শস্য বিপণন কোম্পানিগুলোও বিশ্বে তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ভয়াবহতা কতটা ছড়ায়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোয় বিশ্ব খাদ্যবাজারের ভবিষ্যৎ।